Monday, December 12, 2011

মরণের গান

Friday, December 10, 2010 at 10:35:00 PM

কাল সারা রাত বরফের ঝড় হয়েছে। কি ভীষণ শোঁ, শোঁ শব্দ। সারা বাড়ি থরথর করে কাঁপছিলো। তারাদের ঝড়ও হয়ত এমনই হয়।

আমি বাইরে বরফের উপর গিয়ে বসেছিলাম। দুই হাঁটুর ভিতর মাথা গুঁজে শুধুই কাঁদছিলাম। আমার পা চলছিলো না। হাত চলছিলো না। একটুও নড়তে পারছিলাম না।

কিন্তু ওভাবে তো বেশীক্ষণ বেঁচে থাকা দূরের কথা, কাঁদাও যায় না। ঠান্ডায় নিঃশ্বাস পর্যন্ত বরফের টুকরো হয়ে যায়।

কোনমতে নিজেকে বস্তার মত টেনে হিঁচড়ে ঘরের ভিতর এনে ফেললাম। এক মেঝে ভর্তি বরফ গলা জলের মধ্যে কোনমতে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গিয়ে মনে হ’ল ঘরের মেঝেটা বুঝি গ্লেসিয়ারের মত আস্তে আস্তে পায়ের নীচ থেকে সরে যাচ্ছে।

আমি হাতের দশ আঙ্গুল দিয়ে বিচ্ছিরি ওই শাদা দেয়ালটা খামচে ধরলাম।যদি সেভাবেও শেষপর্যন্ত বেঁচে থাকা যায়। আমার নখ দেয়ালের ভিতর ঢুকে পিছলিয়ে নীচে নামতে নামতে ‘করর্ করর্’ করে উঠল। ছুরি দিয়ে মানুষের হৃৎপিন্ড চিরে দিলেও ঠিক এমনই একটা শব্দ হয়!

মনে হ’ল একটা টানেলের ভিতর দিয়ে চলেছি। টানেলটার শুরুতে মৃত্যু দাঁড়িয়ে আছে, শেষেও মৃত্যুই দাঁড়িয়ে আছে। আসলে হয়ত শুধু থেমে থাকলেই জীবনের টানেলে বেঁচে থাকা যায়। তবু পা দু’টো যেহেতু শরীরের সাথে সেলাই করা আছে, না চলে তো পারা যায় না!

আমি ভাবলাম টানেলটাতে হয়ত কোন আলোই থাকবে না। কিন্তু আশ্চর্য! পুরো টানেলটা পূর্ণ চাঁদের আলোতে ভেসে যাচ্ছিলো। ইস্পাতের তরবারির উপর আলো পড়লে যেমন সব উল্টোদিকে ঠিকড়ে পড়ে, ঠিক তেমন ধারালো শাদা সব কিছু।মরুভূমিতে বালুর উপর মরীচিকা হয়। আর এমন শীতের দেশে আকাশের উর্দ্ধ মরীচিকায় মনে হ’ল আমার মৃতদেহটা যেন আমারই চোখের সামনে ওই দিগন্তের উপর ভাসছে।

আমি আচ্ছন্নের মত রান্না ঘরের মাংস কাটবার ছুরিটা দেখতে থাকলাম। এত্ত লোভ হচ্ছিলো! অজগরের চোখের সামনে মানুষ যেমন হাত, পা নাড়তে ভুলে যায়, ঠিক সেভাবে আমি গ্যাস ওভেনটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। আমার শূন্য খুলির ভিতর সিলভিয়া প্লাথের সমস্ত কবিতা ফিনিক্স পাখির মত আগুনের ফুল হয়ে ফুটে উঠলো।

দূরের চার্চ থেকে ঘন্টার শব্দ ভেসে এল। অথচ আমার কেন যেন হঠাৎ মনে হ’ল আমি বুঝি একটা জলশঙখ কানে দিয়ে সমুদ্রের শব্দ শুনছি। দূরে কোথায় যেন ক্লান্ত জলকন্যারা গান গাচ্ছে। সে গান একাকী ‘লুন’দের ডাকের মত সমস্ত অস্তিত্ব কাঁপিয়ে দিয়ে আমাকে দিশাহারা করে ফেলল।

হাতের উপর নিজের রক্তমাখা হৃৎপিন্ডটা বের করে রাখলাম। হৃৎপিন্ডটা শরীরের বাইরে বের হয়ে এসেও এত্ত ভীষণ ধুকপুক করছিলো। আমি ভাবলাম কে জানে এভাবেই বোধ হয় মায়াবিনীরা ক্রিস্টাল বলের দিকে তাকিয়ে রুপালি, কমলা, হলুদ, লাল মেঘ দেখে জীবনের সব স্বপ্ন বলে দেয়। স্বপ্নহীন আমি নিজের হৃৎপিন্ডের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভাবলাম সব ভাত পচে মদ হয়। কোনো কোনো হৃৎপিন্ড পচেও আসলে কখনো।আমার হাতের ভিতর লাল রঙের গুবরে পোকার মত হৃৎপিন্ডটা জ্বলজ্বল করতে থাকল। কালো, কালো কি অদ্ভুত সুন্দর ছিট, ছিট তাতে। ওই কালোগুলো আমার পাপের রঙ।

কেন যেন মনে হ’ল যদি এখন এই মাংসপিন্ডটা মাটিতে ছুঁড়ে দেই, কে জানে হয়ত এত কিছুর পরও আমার হৃৎপিন্ডটা পাড়িয়ে যখন ওরা চলে যাবে, এই হৃৎপিন্ড থেকেও হয়ত দাঙ্কোর মতই আলো ছড়াবে। মানুষ তো মরে না!

আমার দুই চোখ বেয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়তে থাকল। ঠোঁট থরথর করে কাঁপছে। হাতদুটো মুঠো করে আমি কোনমতে মেঝে আঁকড়ে ধরে বহুবারের মত আর একবার, শেষবার বাঁচবার চেষ্টা করলাম। রোজারির এক একটা কালো পুঁতির ভিতর এক একটা নিঃশ্বাস গুনে বাকি রাত আমি কোনমতে শুধু গেয়ে কাটালাম, ‘তুমি কিছু নিয়ে যাও বেদনা হতে বেদনে...’

রান্নাঘরের ছোট জানালাটাকে মনে হ’ল যেন সেই ক্যান্টারবেরী ক্যাথিড্রালের অপরূপ কারুকাজ করা এক গথিক স্টেইনড গ্লাস উইনডো হয়ে গেছে। লাল, নীল কাচের যীশু আর মেরীর মুখ জুড়ে শীতকালের সূর্যের আলো আমার হাতে ধরে থাকা ছুরির উপর এসে পড়ল।

কোনমতে নিজেকে মাটির উপর দিয়ে টেনে হিঁচড়ে নীল রঙের দরজাটা খুলে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার একটু আগে আমি শুধু দেখলাম সব শাদা বরফ ফুঁড়ে কিভাবে যেন তিনটা সোনালি রঙের ক্রোকাস ফুটে উঠেছে! ঘরের ভিতর থেকে অকারণেই চাঁদহীন আমাকে ভাসিয়ে দিয়ে গান ভেসে এল,
‘ও চাঁদ, চোখের জলের লাগল জোয়ার দুখের পারাবারে,
হল কানায় কানায় কানাকানি এই পারে ওই পারে।।
আমার তরী ছিল চেনার কূলে, বাঁধন যে তার গেল খুলে;
তারে হাওয়ায় হাওয়ায় নিয়ে গেল কোন্ অচেনার ধারে।।’

No comments:

Post a Comment